লেখক-কবিকে সমাজ ও রাষ্ট্র একটা সম্মান দেয়

লেখক-কবিকে সমাজ ও রাষ্ট্র একটা সম্মান দেয়। কেন দেয়? লেখক-কবি তো ধানের নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেন না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে কোন নতুন অবদান রাখেন না*। ভ্যালিউড সিটিজেন হিসেবে তাদের গ্রাহ্য করা হয়। এটা একারণে করা হয় না যে তিনি প্রেমের কবিতা লিখে অষ্টাদশী তরুণীর হৃদয় দখলের নকশাটা আয়ত্ত করেছেন।

লেখক এবং কবিকে মানুষ অবচেতনে যে সম্মানটা দেন তার পেছনের কারণটা হচ্ছে তাদের দায়িত্ব হলো জাতির ভয়েস হিসেবে তিনি কথা বলবেন। যেই কথা চল্লিশজন বলতে পারেনি, তিনি তাদের ভয়েস হবেন। লেখকদের পাত্তা যে মানুষ একারণে দেয় – সেটা তারা নিজেরাও অনেক সময় জানে না। এজন্য লেখকদের ওপর ক্ষেপে যাওয়া, গালি দিতে আসার ঘটনাটি ঘটে। কারণ তারা আশা করেছিল এই লেখকটি তার cause, তার ফাইট নিয়ে আলাপ করবে। করেনি।

লেখক যদি তার জনতার মনের, মুখের কথা না বলে স্রেফ প্রেমের গল্প লিখেন, ফেসবুকে আলাপ করেন শুধুই ফুল-ফল-লতা-পাতা নিয়ে, তাহলে জনগণের কোন দায় নেই লেখক ও কবিদের পাত্তা দেবার।

আমি বলছি না আপনি চাইলেই ফুল-ফল নিয়ে আলাপ করতে পারবেন না। অবশ্যই পারবেন। কিন্তু মানুষের ভয়েস না হয়ে যদি শুধু শক্তিশালী পক্ষের অনুমোদিত আলাপ করে যান, তাহলে সম্মানটা পাবেন না এই আরকি।

লেখকরা গিফটেড। তারা আলাপ করতে পারেন। প্রকাশ করতে পারেন লোকের সামনে নিজেকে। সমালোচিত হবার ট্রেনিং তাদের আছে, তাদের আছে গণ্ডারের চামড়া। এই গণ্ডারের চামড়া সাধারণ লোকের কাছে তো আশা করলে হবে না।

গণ্ডারের চামড়া যদি জনগণকে, যারা কথা বলতে পারছে না তাদের হয়ে কথা বলে তাদের প্রটেক্ট করতে ব্যবহার না করেন, তাহলে আসলে মানবসভ্যতার শুরু থেকে যে কারণে দার্শনিক ও লেখক-কবি-গায়ককে সম্মান দেয়া হয়েছে তার মূল শর্তটিই ভাঙা হয়।

লেখকদের বা কবিদের সম্মান করার আর কোন কারণ থাকে না।
গত ৫৫ টি বছরে নানা কারণে আমাদের প্রায় সব কবিরা প্রেম আর প্রায় সব লেখকরা লুতুপুতু নিয়ে ব্যস্ত হয়েছেন, যে কারণে এই পেশাদুটো নিয়ে সমাজে একটা নাক সিঁটকানোর ব্যাপার দেখা গেছে। কেন এই নাক সিঁটকানো – তাও কেউ সচেতনে জানেন না। তবে জনগণ ফিল করতে পারে আপনি তার হয়ে কথা বলছেন না, মেয়ে পটাচ্ছেন কেবল।

আমি বিশ্বাস করি আমাদের জেনারেশন একটা রেনেসাঁ ঘটাবে, আর লেখক ও কবিরা ফিরে পাবে তাদের সম্মান।
তবে এজন্য, মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা আর প্রেমের গল্প লিখেই দায়িত্ব খালাস হয়ে গেছে ভাবাটা বন্ধ করতে হবে। বইপত্রে যা ভালো লাগছে তা লিখছেন লিখুন, ওটাই স্বাভাবিক।

তবে আপনার একটি গণ্ডারের চামড়া আছে – তার প্রয়োগ সোশাল মিডিয়ায় দেখাবার দায়িত্বটি আপনি এড়াতে পারবেন না।

একজন পুলিশ অফিসার ডাইনিংয়ে রাতে খাবার খেতে গেলে সেখানে যদি ডাকাত পড়ে – তাহলে পুলিশটির দিকে সমাজ তাকায় যে তিনি ডাকাতটাকে ঠেকাবেন, যদিও তিনি অফ ডিউটিতে।

তেমনই, আপনার জনরা প্রেমের কবিতা হতে পারে, ফেসবুকে যখন সেলফি দিতে আসেন, সেখানে একটা ক্রাইসিস চললে তা এড়িয়ে যাওয়া কবিদের বা লেখকদের সাজে না।

ওই গণ্ডারের চামড়াটি বা পুলিশের ট্রেনিংটি সমাজের স্বার্থেই ডেভেলপ করা হয়েছে। তার মর্যাদা লেখক ও কবিদের রাখতে হবে। টু সার্ভ অ্যান্ড টু প্রটেক্ট।

* হাইব্রিডদের মানে যারা গল্প-উপন্যাস-কবিতা-ননফিকশন লিখেন আবার বিজ্ঞানেও অবদান রাখেন – তাদের হিসাব আলাদা, সবাই হাইব্রিড হবেন এটা আশা করা উচিত নয়

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top